Ghor - Ahmed Firoze

ঘর
আহমেদ ফিরোজ

—বাবা আমাকেও কি চলে যেতে হবে?
—বড়দি, মেজদি তাদের কথা মনে পড়ে তোমার?
—আমি যখন অনেক ছোট তখনই ভালো ছিলাম। বড়দি মাটি দিয়ে ঘর বানাত, আর আমি ভেঙে দিতাম। অমনি মেজদির থাপ্পড়, পিঠে পাঁচাঙ্গুলের দাগ বসে যেত।
—তোমার মনে আছে বাবা, গত বর্ষায় আমার জ্বর হলো, আর অমনি তুমি ডাক্তার-কবিরাজ কত-কি করলে। অবশেষে ডাক্তার কী বলল? ‘আপনার মেয়ের তেমন কিছু হয়নি, এই একটু-আধটু জ্বর। বৃষ্টিতে ভিজলে এমন তো হবেই।’ সেই থেকে তুমি বৃষ্টিতে ভিজতে দাও না। তুমি ভাবো—ভিজলেই বুঝি জ্বর আসে? আচ্ছা, তবে তোমার কেন জ্বর হয়? তুমি তো আর বৃষ্টিতে ভেজ না। নাকি তুমিও চুপিচুপি আমার মতো ভিজ?
—তোমার সে কথা মনে আছে, তুমি তখন সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্স আদায় বিভাগে কাজ করতে। মাঝে মাঝেই তুমি রাতে ফিরতে না। মা তখন বেঁচে আছে। আমার বয়স কত আর—তিন চার।
—একবার তুমি অনেক রাত করে ফিরলে। মা-র পাশে আমি ঘুমিয়ে আছি। তোমার আর মা-র ফিসফিস কথাবার্তায় জেগে উঠলাম। তুমি অনেক আদর করে দিলে আর পিঠে হাত দিতেই টের পেলে মেজদির স্পর্শাঘাত। অত রাতে মেজদিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে কি মারটাই না মারলে। জানো, এরপর আর কোনোদিন মেজদি আমার গায়ে হাত তোলেনি, মেজদিকে তুমিও না। সে রাতে তুমি শরিষার তেল গরম করে আমার পিঠে মালিশ করে দিয়েছিল। আমার বেশ মনে আছে।
—আচ্ছা, মা-র মারা যাওয়ার কত বছর হবে?
—আট-দশ বছর, না না অত কেন হবে? মনে হয় এইতো সেদিন।
—মা বেগুন ভাজি করে প্লেটের উপর সাজিয়ে রাখত, পাশে ইলিশের আলুপাতা ভত্তা, আর কালাইয়ের ডাল। তোমার খুব প্রিয়। আর মধ্যবিত্তের এর চেয়ে খুব বেশি-কি জোটে প্রতিদিন?
—মা রান্না পর গোসল করে এলো। তুমি মা-র আঁচলের তল দিয়ে হাত পেঁচিয়ে ধরলে, যখন সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পা-পিছলে পড়ে যাচ্ছিল। তোমার এই হিরোচিত স্বভাবে আমি, বড়দি বেশ হেসেছিলাম।
—এর পর আমরা খাচ্ছিলাম সবাই, শুধু মেজদি ছিল না। ওর সেদিন বৃত্তি পরীক্ষার ফল দেবে। তুমিও গিয়েছিলে, কিন্তু দেরি দেখে ওকে রেখে আসতে চাইলে, আমাদের পাড়ার ফুফাত ভাই হাসান এগিয়ে এসেছিল বড় ভাইয়ের চরিত্রে। তুমি বেশ স্বস্তিতেই ফিরেছিলে হাসন ভাইকে রেখে।
—মেজদি রেজাল্ট নিয়ে ফিরল সন্ধ্যার পর। তুমি প্রতিদিনকার মতো বাজারে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে তাসের আসরে বসেছ। মা, আমি, বড়দি বসে বসে টিভি দেখছিলাম। মেজদি ফাইভের পর এইটেও বৃত্তি পেল, এই আনন্দে দরজা আটকিয়ে গলা ছেড়ে হাছন রাজার গান গাইছিল।
—হঠাৎ করে সংবাদ এলো বড়দির বান্ধবী এষাকে তুমি নাকি বিয়ে করতে যাচ্ছ। আমরা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কিন্তু সংবাদ নিয়ে এসেছিল হাসান ভাই। অবিশ্বাসের কিছু ছিল না।
—বড়দি, মেজদি হাসান ভাইয়ের সঙ্গে বের হলো, যাতে কোনোভাবেই সংবাদটি সত্য না-হয়। আমি ছোট বলে আমাকে নেয়া হলো না।
—এষা আর বড়দি এ-বছর একসঙ্গেই এসএসসি দিয়েছিল, রেজাল্ট হয়নি।
—আমি তখন ছুটে গিয়ে আমাদের পুকুরের পুব পাশে যেখানে শিমুল গাছের সঙ্গে বেড়ে উঠেছিল বাঁশঝাড়, সেখানে দাঁড়ালাম। ওখান থেকে কোনো বাড়ি-ঘর দেখা যেত না। সুবিস্তৃত মাঠ। ধানের জমি, একটু দূরে নিচু—ওখানে পানি। আমার দেখা ওঠাই প্রথম নদী আর সাগর।
—একটু দূরে গির্জাঘরে ন’টার ঘণ্টা বাজল। মাকে একা রেখে এসে দাঁড়িয়ে আছি, মনে হতেই দৌঁড়ে গেলাম।
—না, এষা আসেনি। বড়দি, মেজদি এসেছে। হাসান ভাইকে দেখা গেল না। বাবা এসেছে কিনা জানতে ঘরে যেতেই মেঝেতে মাকে পড়ে থাকতে দেখলাম। বড়দি, মেজদি জড়সড় হয়ে বসে আছে সিঁড়িতে। আমাদের বাড়ির আশেপাশে যে দু-তিনটা বাড়ি ছিল সেখান থেকে কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল না, যেন সবকিছু নীরব-নিস্তব্ধ। বাড়ির পাশ দিয়ে সরু পথে কেউ যেন আজ আর যাবে না।
—বাবা আসল সঙ্গে বড় মামা। সেই নাকি বাবাকে উস্কে দিয়েছিল।
—পরে বড়দিকে বলেছিলাম, আমাদের ভাই নাই তো কি হয়েছে? বড় মামার মতো ভাই দরকার নাই।
—বড়দির ভাইপ্রীতি সেই থেকে হারিয়ে গেল।
—মেজদি এসএসসি দেবার দু’মাস পরেই হাসান ভাইয়ের সঙ্গে পালাল। বাবা সামাজিক সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে শেষাব্দি রাজি হলো বিয়েতে। হাসান ভাইয়ের ফ্যামিলি আগে থেকেই সম্মত ছিল।
—বড়দি নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিল। দিন দিন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল। এষার বাবা মজিদ ভাইয়ের সঙ্গে এষাকে বিয়ে দিল। মজিদ ভাই বড়দিকে পছন্দ করত, বড়দিও। কিন্তু হাসান ভাইয়ের বড় মজিদ ভাই, সে কারণে বড়দি মুখ বুজে পিছু হটল। মজিদ ভাই বিয়ের একদিন আগেও আসল, কিন্তু বড়দির না আর হ্যাঁ হলো না। মজিদ ভাইও রেগে-মেগে এষাকেই বিয়ে করল।
—একা-বাড়িতে এষা এবং মেজদি। তারপর কি জেনেছিল মেজদি? সে কারণে কাছে থেকেও পর হয়ে গেল। আমি গেলে মেজদি কিছু বলেনি, এষাকে দিয়ে বলিয়েছিল আমরা যেন আর না আসি।
—বড়দি বিএ পাশ করে একরকম বসে, বেকারই। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পদে পরীক্ষা দিলে ভাইভা কার্ডও আসে। কিন্তু চাকরি হয় না।
—এর মাস-ছয়েক পর বড়দি একটা এনজিওতে জয়েন্ট করে। সেখানকার নতুন ম্যানেজার একরকম পারিবারিকভাবে বিয়ে করেই দূর শহরে নিয়ে যায়।
—আমরা শহরটাকে চিনতাম না।
—আমি তখন ক্লাস সেভেনে।
—বাবা ধীরে ধীরে একা হয়ে যেত লাগল, আমিও।
—গার্লস স্কুলে পড়ার কারণে আমার কোনো ছেলে বন্ধু নেই, দু-একজন মেয়ে বন্ধু থাকলেও তারা অন্যদৃষ্টিতে তাকাত আমার দিকে।
—পুরো বাড়িতে আমরা দু’জন। বাবার রিটায়ের্ডমেন্টের পর প্রাপ্ত টাকা তাসের ঘরেই পুরোটা চলে যায়। সামান্য জায়গা-জমিন যা-ছিল তাও শীঘ্রই বেঁচে-খেয়ে-খেলে সাফ। বাবা পুরো বেকার হয়ে গেল। আমারো এইচএসসি ভর্তি হওয়ার পর আর পড়া হলো না। তখন বাড়িটাই শেষসম্বল হিসাবে ঝুঁকিতে আছে।
—বাবা এখন আর তাস খেলতে যায় না, বাজারেও না। তার খেলার সঙ্গী এখন শুধু আমি।
—সমাজে যারা একঘরে হয়ে যায়, তাদের রান্নার পাতিল বুঝি ফুটো হয়ে যায়? আর পেটে খাবার না-থাকলে ধর্ম-কর্মও থাকে না। ষাটোর্ধ্ব বাবাই এখন ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাড়ার দু-একজন ছেলেরা আসে যারা জোর-জবরদস্তি করে বাড়িটা লিখে নিতে চায়। তাদের সাথে পুতুলজীবনের ঘর ঘর খেলি, দরজা-জানালা খুলি-আটকাই—শেষাশ্রয়টুকু হারাবার ভয়ে; ঘরটা মাটির নয়—মাংসল, তাই আর ভাঙতে পারি না।
—বয়সী পিতার ঘরও কি ভাঙা যায়?

Share us

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *